বুধবার, ২৬ মার্চ, ২০১৪

পতাকা- রাশেদুজ্জামান রন।

সুনসান নিরবতা...!

একটা বিরান প্রান্তর...
মরচে পড়া আধো সোনালী রঙ
কিংবা স্যাঁতস্যেঁতে শ্যাওলা মাটিময়
অথবা পুড়ে যাওয়া ছাই রঙ্গা বুকের জমিন!

লাল রঙ বৃষ্টিতে ভাসিয়ে দু'কূল
পাজরের হাড় ক'খানা
ছিন্ন-বিছিন্ন শাড়ী
বেড়িয়ে আসা লজ্জায় নত করোটি!

বারুদের গন্ধে মাতম তোলে
হিংস্র হায়েনা
সঙ্গমে রত শুয়োরের দল
অবলীলায় ভুলে যায় মনুষ্যত্ব
ধম্মের বাণী পদতলে
নীতির বালাই নেই
ম্যাকিয়েভেলি ধন্যবাদ তোমায়!

মহা প্লাবন শুরু হয় জনন যন্ত্রে
উগড়ে দেয় রিক্ত হস্ত
ছোট্ট ডেভিড ছুটে চলে
গোলিয়াথের খোঁজে...!

মায়ের হাসি
বোনের টিকলি
বাবার চটি
দিদার চশমা
ফিরিয়ে দিতে চাই!

কাঁদতে থাকে শিশু তপ্ত চোখে
জলে জলে সিজিত প্রান্তর
সবুজে সবুজে গাঢ় সবুজ
ঢেলে দিলাম পাজরের লাল!

*মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়লে, মুক্তিযোদ্ধা ও পতাকা দেখলে, দেশের গান শুনলে বুকের ভিতর ক্যামন যেনো করে...! প্রবাসীদের নিশ্চয় আরো বেশি করে! আমার সেই সমস্ত ভাই ও বন্ধুদের তরে...
রাশেদুজ্জামান রন।

দোতলার ল্যন্ডিং মুখোমুখি ফ্ল্যাট। একজন সিঁড়িতে, একজন দরোজায় -আহসান হাবীব

: আপনারা যাচ্ছেন বুঝি?
: চ’লে যাচ্ছি, মালপত্র উঠে গেছে সব।
: বছর দু’য়েক হ’লো, তাই নয়?
: তারো বেশি। আপনার ডাকনাম শানু, ভালো নাম?
: শাহানা, আপনার?
: মাবু।
: জানি।
: মাহবুব হোসেন। আপনি খুব ভালো সেলাই জানেন।
: কে বলেছে। আপনার তো অনার্স ফাইনাল, তাই নয়?
: এবার ফাইনাল
: ফিজিক্স-এ অনার্স।
: কি আশ্চর্য। আপনি কেন ছাড়লেন হঠাৎ?
: মা চান না। মানে ছেলেদের সঙ্গে ব’সে…
: সে যাক গে, পা সেরেছে?
: কি ক’রে জানলেন?
: এই আর কি। সেরে গেছে?
: ও কিছু না, প্যাসেজটা পিছল ছিলো মানে…
: সত্যি নয়। উঁচু থেকে পড়ে গিয়ে…
: ধ্যাৎ। খাবার টেবিলে রোজ মাকে অতো জ্বালানো কি ভালো?
: মা বলেছে?
: শুনতে পাই? বছর দুয়েক হ’লো, তাই নয়?
: তারো বেশি। আপনার টবের গাছে ফুল এসেছে?
: নেবেন? না থাক। রিকসা এলো, মা এলেন, যাই।
: যাই। আপনি সন্ধেবেলা ওভাবে পড়বেন না,
চোখ যাবে, যাই।
: হলুদ শার্টের মাঝখানে বোতাম নেই, লাগিয়ে নেবেন, যাই।
: যান, আপনার মা আসছেন। মা ডাকছেন, যাই।

সোমবার, ২৪ মার্চ, ২০১৪

ভারবাহী পশু- রাশেদুজ্জামান রন।

শৈশব-কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনের উত্তেজনায় মিশে থাকে
অনেক আশা
ভালবাসার ভাববাদী সংক্রমণে উড়ে আসে এক ঝাঁক স্বপ্ন,
আশা ও স্বপ্নের সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয় পাওয়া না পাওয়ার
খেরো খাতা
বংশ দন্ডের উচ্চ লম্ফে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়ে অনাগত ভবিষ্যত
সন্তান! তুমিতো আমার দুঃখ মোচনের শোষক পেপার
শুষে নাও আমার যত দুখ...
সত্যি, পারো কি তাই
আজো হিসেব মেলেনি

সব বন্ধন ছিন্ন করে বৈষয়িক ভাবনায় গড়ে ওঠে একজন ভারবাহী পশু
উত্তেজিত প্রতিবাদ বা মিঁইয়ে পড়া মৌনতায় জমে ওঠে কানাকানি
অভিমানগুলো স্বার্থপরতার ঢঙ্গে আত্নপ্রকাশ করে আপন আলয়ে
প্রকাশ্যে ভালবাসা পূর্ণরুপে এলেও আড়ালেই তার কদর্য রুপ
এ যেনো মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ!

বৈষয়িক লালসায় পশু হয় স্বার্থপর পাষাণ
সম্পদের লোভে বন্ধন হয়ে পড়ে কন্টকময়
অস্থি-চর্ম সার খোলসের ভিতরে ভারবাহী পশু,
বলে ওঠে, "আমাকে মুক্তি দাও!"

শুরু ও শেষের কান্নার মাঝে কোনো পার্থক্য খুঁজে পাইনা
ভারবাহী পশু, কী হবে এসব দিয়ে?

*বৈরাগ্য ভাববেন না, উপলব্ধি ভাবুন!

বৃত্ত- রাশেদুজ্জামান রন।

জানালা গলে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে রুপালী চাঁদ
মৃদুমন্দ হাওয়ার সাথে জোট বেঁধেছে
নিরাবরণ দেহে আছড়ে পড়ে চুম দেয়
এলো চুলের নরম ছোঁয়া

আবেশ ছড়ানো স্পর্শে মাতাল প্রকৃতি
নোনা জল শুষে নেয় দুঃখগুলো
নৈঃশব্দের মাঝে খেলা করে ঝিঁঝিঁ পোকা...
জোনাক হারিয়েছে তাবৎ আলো
ধর্ষিত আজ চাঁদের কাছে
তবুও আনন্দিত, লাজ-শরমের বালাই নেই

একাকি নির্ঘুম
ভেবে চলেছি, "আমরাও তো তাই...!"
প্রকৃতির কাছে হেরে চলেছি প্রতিনিয়ত
তবু দর্প কমেনা একটুও

অহংবোধের দোরে দেয়াল তুলেছি
আমিত্বের ইট-বালুতে
খসে পড়া দেহ লুকোতে
খুঁজে নেই মিথ্যে ছল-ছুতো

শেষে খুঁজে ফিরি আমি কে, তুমি কে?

২৪।০৩।১৪

বৃহস্পতিবার, ২০ মার্চ, ২০১৪

একটি পতাকা পেলে – হেলাল হাফিজ।



কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে

আমি আর লিখবো না বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা

কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে

ভজন গায়িকা সেই সন্ন্যাসিনী সবিতা মিস্ট্রেস

ব্যর্থ চল্লিশে বসে বলবেন,–’পেয়েছি, পেয়েছি’।

কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে

পাতা কুড়োনির মেয়ে শীতের সকালে

ওম নেবে জাতীয় সংগীত শুনে পাতার মর্মরে।

কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে

ভূমিহীন মনুমিয়া গাইবে তৃপ্তির গান জ্যৈষ্ঠে-বোশেখে,

বাঁচবে যুদ্ধের শিশু সসন্মানে সাদা দুতে-ভাতে।

কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে

আমাদের সব দুঃখ জমা দেবো যৌথ-খামারে,

সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক চাষাবাদে সমান সুখের ভাগ

সকলেই নিয়ে যাবো নিজের সংসারে।

কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প – রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ।

তাঁর চোখ বাঁধা হলো।
বুটের প্রথম লাথি রক্তাক্ত করলো তার মুখ।

থ্যাতলানো ঠোঁটজোড়া লালা-রক্তে একাকার হলো,
জিভ নাড়তেই দুটো ভাঙা দাঁত ঝরে পড়লো কংক্রিটে।
মা…..মাগো….. চেঁচিয়ে উঠলো সে।

পাঁচশো পঞ্চান্ন মার্কা আধ-খাওয়া একটা সিগারেট
প্রথমে স্পর্শ করলো তার বুক।
পোড়া মাংসের উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো ঘরের বাতাসে।
জ্বলন্ত সিগারেটের স্পর্শ
তার দেহে টসটসে আঙুরের মতো ফোস্কা তুলতে লাগলো।

দ্বিতীয় লাথিতে ধনুকের মতো বাঁকা হয়ে গেলো দেহ,
এবার সে চিৎকার করতে পারলো না।

তাকে চিৎ করা হলো।
পেটের ওপর উঠে এলো দু’জোড়া বুট, কালো ও কর্কশ।
কারণ সে তার পাকস্থলির কষ্টের কথা বলেছিলো,
বলেছিলো অনাহার ও ক্ষুধার কথা।

সে তার দেহের বস্ত্রহীনতার কথা বলেছিলো-
বুঝি সে-কারণে
ফর ফর করে টেনে ছিঁড়ে নেয়া হলো তার শার্ট।
প্যান্ট খোলা হলো। সে এখন বিবস্ত্র, বীভৎস।

তার দুটো হাত-
মুষ্টিবদ্ধ যে-হাত মিছিলে পতাকার মতো উড়েছে সক্রোধে,
যে-হাতে সে পোস্টার সেঁটেছে, বিলিয়েছে লিফলেট,
লোহার হাতুড়ি দিয়ে সেই হাত ভাঙা হলো।
সেই জীবন্ত হাত, জীবন্ত মানুষের হাত।

তার দশটি আঙুল-
যে-আঙুলে ছুঁয়েছে সে মার মুখ, ভায়ের শরীর,
প্রেয়সীর চিবুকের তিল।
যে-আঙুলে ছুঁয়েছে সে সাম্যমন্ত্রে দীক্ষিত সাথীর হাত,
স্বপ্নবান হাতিয়ার,
বাটখারা দিয়ে সে-আঙুল পেষা হলো।
সেই জীবন্ত আঙুল, মানুষের জীবন্ত উপমা।
লোহার সাঁড়াশি দিয়ে,
একটি একটি করে উপড়ে নেয়া হলো তার নির্দোষ নখগুলো।
কী চমৎকার লাল রক্তের রঙ।

সে এখন মৃত।
তার শরীর ঘিরে থোকা থোকা কৃষ্ণচূড়ার মতো
ছড়িয়ে রয়েছে রক্ত, তাজা লাল রক্ত।

তার থ্যাতলানো একখানা হাত
পড়ে আছে এদেশের মানচিত্রের ওপর,
আর সে হাত থেকে ঝরে পড়ছে রক্তের দুর্বিনীত লাভা-

তোমার কথা ভেবে – রফিক আজাদ।

তোমার কথা ভেবে রক্তে ঢেউ ওঠে—
তোমাকে সর্বদা ভাবতে ভালো লাগে,
আমার পথজুড়ে তোমারই আনাগোনা—
তোমাকে মনে এলে রক্তে আজও ওঠে
তুমুল তোলপাড় হূদয়ে সর্বদা…
হলো না পাশাপাশি বিপুল পথ-হাঁটা,
এমন কথা ছিল চলব দুজনেই
জীবন-জোড়া পথ যে-পথ দিকহীন
মিশেছে সম্মুখে আলোর গহ্বরে…